logo
logo

জীবিত থাকাকালীন বাবা তাঁর সন্তানদেরকে সম্পত্তি লিখে দিতে পারেন

Blog single photo

জীবিত থাকাকালীন বাবা তাঁর সন্তানদেরকে সম্পত্তি লিখে দিতে পারেন বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রধানত তিনটি পদ্ধতিতে এই কাজটি করা যায়: দান/হেবা (মুসলিম আইন অনুযায়ী), সাফ কবলা (বিক্রি) এবং উইল (Will/وصيت)।


পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সম্পত্তি হস্তান্তরের চেয়ে জীবিত অবস্থায় লিখে দেওয়ার প্রক্রিয়াগুলো সাধারণত বেশি নির্ভরযোগ্য হয়।

জীবিত থাকাবস্থায় সন্তানদের সম্পত্তি লিখে দেওয়ার উপায়

যে পদ্ধতিতে হস্তান্তর করা হবে, তার আইনগত প্রভাব ভিন্ন হবে।

১. দান বা হেবা (Hiba) দলিল (মুসলিম আইন অনুযায়ী)

মুসলিম আইনে এটি একটি শক্তিশালী এবং বহুল প্রচলিত পদ্ধতি, যেখানে কোনো প্রতিদান ছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তর করা হয়।

ক. হেবা দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর


শর্তাবলী: হেবার তিনটি অপরিহার্য শর্ত পূরণ করতে হয়:

১। ঘোষণা (Declaration): দাতা (বাবা) তার সম্পত্তি দান করার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেবেন।

২। গ্রহণ (Acceptance): গ্রহীতা (সন্তান) দানটি গ্রহণ করবেন।

৩। দখল অর্পণ (Delivery of Possession): দাতা সঙ্গে সঙ্গে গ্রহীতাকে সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেবেন।

রেজিস্ট্রেশন: যদিও হেবা সম্পন্ন হওয়ার জন্য দখল হস্তান্তরই যথেষ্ট, তবে আইনি জটিলতা এড়াতে এবং মালিকানা নিশ্চিত করার জন্য হেবা দলিলটি অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে (সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ধারা ১২৩)।

সুবিধা: রক্তের সম্পর্কের মধ্যে হেবা দলিল করলে স্ট্যাম্প শুল্ক ও রেজিস্ট্রেশন ফি তুলনামূলকভাবে কম হয়।

প্রভাব: একবার সঠিকভাবে হেবা সম্পন্ন হলে তা আর ফেরত নেওয়া যায় না।

২. সাফ কবলা বা বিক্রয় দলিল (Sale Deed)

যদিও এটি বিক্রি, কিন্তু বাস্তবে সন্তানকে নামমাত্র মূল্যে বা কিছু মূল্য দেখিয়ে হস্তান্তর করা হয়।

শর্তাবলী: এক্ষেত্রে বাবা তাঁর সম্পত্তি একটি নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে সন্তানের কাছে বিক্রয় করেন। যদি বাবা চান যে কেবল কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হোক, তবে নামমাত্র মূল্য (Nominal Consideration) দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করা যেতে পারে।

রেজিস্ট্রেশন: সাফ কবলা দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হবে। এই ক্ষেত্রে দলিল ও রেজিস্ট্রেশন খরচ হেবার চেয়ে সাধারণত বেশি হয়।

সুবিধা: এটি একটি সন্দেহাতীত মালিকানা দলিল এবং সবচেয়ে আইনিভাবে সুরক্ষিত পদ্ধতি।

৩. উইল বা অছিয়তনামা (Will)

এটি এমন একটি দলিল, যা পিতার মৃত্যুর পর কার্যকর হবে।

শর্তাবলী: বাবা তাঁর জীবদ্দশায় এই দলিল তৈরি করে যেতে পারেন, যেখানে উল্লেখ থাকবে তাঁর মৃত্যুর পর কারা কতটুকু সম্পত্তি পাবে।

মুসলিম আইনে সীমাবদ্ধতা: কোনো মুসলমান তার মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের (1/3rd) বেশি কোনো অ-ওয়ারিশকে বা কোনো একজন ওয়ারিশকে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি ছাড়া উইল করতে পারেন না।

যদি কোনো বাবা শুধুমাত্র একজন সন্তানকে বা সন্তানদের মধ্যে কাউকে বেশি সম্পত্তি দিতে চান, তবে অন্য ওয়ারিশদের লিখিত সম্মতি প্রয়োজন হবে।

রেজিস্ট্রেশন: উইল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে আইনি জটিলতা এড়াতে রেজিস্ট্রি করা উত্তম।

প্রভাব: উইল জীবিত থাকাকালীন কার্যকর হয় না, এটি কেবল পিতার মৃত্যুর পরই কার্যকর হবে।

৪. ট্রাস্ট বা ওকফ (Trust or Waqf)

সম্পত্তি যদি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা ব্যবস্থাপনার জন্য হস্তান্তর করতে চান, তবে ট্রাস্ট বা ওয়াকফ গঠন করা যেতে পারে। তবে এটি ব্যক্তিগত হস্তান্তরের চেয়ে ভিন্ন।


আইনি পদক্ষেপ ও করণীয়

সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নিশ্চিত করুন:

১। সম্পত্তির রেকর্ড হালনাগাদ: নিশ্চিত করুন যে সম্পত্তির সর্বশেষ রেকর্ড (খতিয়ান, নামজারি, খাজনা) বাবার নামেই হালনাগাদ আছে।

২। দলিলের ধরন নির্বাচন: আপনার আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করে হেবা/দান না সাফ কবলা—কোনটি আপনার জন্য উপযুক্ত হবে, তা নির্ধারণ করুন (সাধারণত আত্মীয়দের মধ্যে হেবা বেশি সুবিধাজনক)।

৩। দখল হস্তান্তর: হেবা দলিলের ক্ষেত্রে, সন্তানদেরকে সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার প্রমাণপত্র তৈরি করুন।

৪। রেজিস্ট্রেশন: সম্পত্তি যে এলাকায় অবস্থিত, সেই এলাকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে যথাযথ স্ট্যাম্প শুল্ক ও ফি পরিশোধ করে দলিল রেজিস্ট্রি করুন।

৫। নামজারি: রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর, সন্তানরা অবশ্যই তাদের নামে ভূমি অফিসে নামজারির (Mutation) জন্য আবেদন করবে। নামজারি হলেই সম্পত্তির চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হবে।


অ্যাডভোকেট মো. নাজমুল হাসান

আইনজীবি ও লেখক।



আপনার মতামত লিখুন

Top